জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর

বিশ্বব্যাপী একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ বেড়েছে ১০ শতাংশ

চলতি বছরের শুরু থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে আশঙ্কার বড় কারণ হয়ে উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি।

চলতি বছরের শুরু থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে আশঙ্কার বড় কারণ হয়ে উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। এ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মাঝেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে বৈশ্বিক একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রমে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় খাতটিতে লেনদেন বেড়েছে ১০ শতাংশ। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংস্থার ২২তম বার্ষিক ‘গ্লোবাল এমঅ্যান্ডএ রিপোর্ট ২০২৫’-এ বলা হচ্ছে, বছরের শুরুর দিকে খাতটিতে দুর্বলতা দেখা যায়। তা কাটিয়ে বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ বাজার এখন গতি ফিরে পাচ্ছে। তবে সামগ্রিক বৈশ্বিক আশাবাদ নয়, বরং অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত এ পুনরুদ্ধারের পেছনে কাজ করছে।

জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ চুক্তির আর্থিক আকার ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের একই সময় এ খাতে চুক্তির অর্থমূল্য ছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩০০ কোটি। বিনিয়োগের এ ঊর্ধ্বগতি টানা দ্বিতীয় বছরে এমঅ্যান্ডএ খাতে প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। খাতটি চলতি বছর ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। ওই বছরের প্রথম নয় মাসে মোট চুক্তির আকার ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি ডলার।

বিসিজির প্রতিবেদনে চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাসংক্রান্ত আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও শুল্কনীতির পরিবর্তনের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছু ক্রেতা এমঅ্যান্ডএ বাজার থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন। তবে অনেক বিনিয়োগকারীই কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদন অনুসারে ২০২১ সালে বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ বাজার চুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরে ওঠে। ওই বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরে সম্পাদিত চুক্তির আকার ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার, এর তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে লেনদেন হয়েছে ৪০ শতাংশ কম।

বিসিজির গ্লোবাল এমঅ্যান্ডএ বিভাগের প্রধান জেনস কেনগেলব্যাখ বলেন, ‘বৈশ্বিক এমঅ্যান্ড খাতে পুনরুদ্ধার হলেও সব ক্ষেত্রে সমানভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছে না। অঞ্চল ও খাতভেদে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আমরা ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) লেনদেনের জন্য প্রস্তুতি বাড়তে দেখছি এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাজারেও অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’

বিসিজির ট্রানজেকশনস অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান ড্যানিয়েল ফ্রিডম্যান বলেন, ‘অনিশ্চয়তাকে সাধারণত লেনদেনের প্রতিকূল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি সবসময় যে একই রকম হবে এমনও নয়। বিচক্ষণ ডিলমেকাররা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে অবিচল থাকেন। তারা সাহসী হলেও পরিমিতি বোধ ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন, যা অস্থির বাজারেও সুযোগ উন্মোচন করতে পারে।’

প্রতিবেদন অনুসারে এবার মোট এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমের ৬২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে উত্তর আমেরিকায়। সেখানে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরে লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় এক-চতুর্থাংশের বেশি বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ইউরোপে এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম ৫ শতাংশ কমে ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে নেমেছে।

খাতভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুসারে প্রযুক্তি, মিডিয়া ও টেলিকম (টিএমটি) খাতে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ হয়েছে সবচেয়ে বেশি, যার আর্থিক মূল্য ৫৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রিয়েল এস্টেট খাতে ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি এবং শিল্প খাতে ২৮ হাজার কোটি ডলারের এমঅ্যান্ডএ চুক্তি হয়েছে।

ইউরোপে সবচেয়ে বড় এমঅ্যান্ডএ বাজার হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য। কিন্তু এবার দেশটিতে চুক্তি মূল্য কমেছে ৩৫ শতাংশ। এছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ অর্থনীতি স্পেন ও ফ্রান্সে চুক্তি কমেছে যথাক্রমে ৫৮ ও ২৯ শতাংশ। দুটোই রেকর্ড মাত্রার পতন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এর বিপরীতে নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও ইতালিতে এমঅ্যান্ডএ চুক্তি বেড়েছে যথাক্রমে ২৬৩, ১০৯, ৪৫ ও ২৮ শতাংশ। নর্ডিক দেশগুলোয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে লেনদেন কমেছে। গত বছরের প্রথম নয় মাসের তুলনায় এমঅ্যান্ডএ চুক্তির অর্থমূল্য ১৯ শতাংশ কমে ২৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অবশ্য সিঙ্গাপুর ও চীনের মূল ভূখণ্ডে এমঅ্যান্ডএ চুক্তি বেড়েছে যথাক্রমে ৩৮ ও ১১ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও হংকংয়ে যথাক্রমে ১৩, ২০ ও ৭৩ শতাংশ পতন দেখা গেছে।

অন্যদিকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার সম্মিলিত লেনদেন বেড়েছে ৬ শতাংশ। কিন্তু এসব অঞ্চলে লেনদেন এখনো গত ১০ বছরের গড়ের নিচে রয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ১০ বিলিয়ন বা হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ২৭টি বড় চুক্তির (মেগাডিল) ঘোষণা দেয়া হয়েছে। গত বছরের একই সময় এর পরিমাণ ছিল ২১টি।

মোট লেনদেন বাড়লেও জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরে আন্তঃসীমান্ত এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম কমেছে। ২০০৭ সালে এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ, চলতি বছর এসে তা দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে।

বিসিজির বিশ্লেষণে দেখা যায়, এমঅ্যান্ডএ খাতে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের তুলনায় অঞ্চলভিত্তিক লেনদেন বেশি ফলপ্রসূ হয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক লেনদেনে দুই বছরের রিলেটিভ টোটাল শেয়ারহোল্ডার রিটার্ন (আরটিএসআর) গড়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। সেখানে অভ্যন্তরীণ লেনদেন কমেছে দশমিক ৯ শতাংশ।

আরও